1. admin@doinikbartamansongbadbd.com : admin :
ইপিজেডে ১৭ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে: দুটি তদন্ত কমিটি গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা পুরো ভবন - দৈনিক বর্তমান সংবাদ
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ময়মনসিংহে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে সম্পৃক্ত জেলা অফিস-বদলী হলো উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভালুকায় সরকারি রাস্তা নষ্ট করে মাটির ব্যবসার অভিযোগ, ভোগান্তিতে এলাকাবাসী নন্দীগ্রামে জাকের পার্টির ৩৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে দাওয়াতী মিশন সভা ভোগান্তিতে ভালুকার কাচিনা ইউনিয়নের কাচারীঘাটা এলাকার বাসিন্দারা, কথা রাখেননি জনপ্রতিনিধিরা সুরখালি ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এস এম নাজমুল ইসলাম ভালুকায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের দাবিও জোরালো বটিয়াঘাটায় বৃদ্ধকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, থানায় এজাহার সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় মৎস্য আড়ত ইজারার দাবিতে মানববন্ধন নন্দীগ্রামে প্রকাশ্যে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায়  সাংবাদিকের ওপর দুর্বৃত্তের হামলা নন্দীগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর বুড়ইল ইউনিয়ন কর্মী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ইপিজেডে ১৭ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে: দুটি তদন্ত কমিটি গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা পুরো ভবন

দৈনিক বর্তমান সংবাদ ডেস্ক :
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯০ বার পঠিত

মো. শহিদুল ইসলাম বিশেষ সংবাদদাতাঃ

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১৭ ঘণ্টা পর অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সেই সঙ্গে প্রকাশ পায় অগ্নিনিরাপত্তায় একাধিক ত্রুটি, ভবন কাঠামোর দুর্বলতা এবং প্রস্তুতির ঘাটতি। ফায়ার সার্ভিস ভবনটিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে এবং ইপিজেড কর্তৃপক্ষসহ দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের ১ নম্বর ফেজ এলাকায় অবস্থিত অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড ও জিহং মেডিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। দুটি প্রতিষ্ঠানই একই সাততলা ভবনে ছিল। অ্যাডামস কোম্পানি ক্যাপ ও তোয়ালে উৎপাদন করত, আর জিহং মেডিক্যাল তৈরি করত সার্জিক্যাল গাউন। ভবনের চারটি তলা গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যেখানে প্রচুর দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল।

আগুন মুহূর্তেই পুরো ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘন ধোঁয়ায় আশপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট কাজ শুরু করলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে দ্রুত বাড়ানো হয় ইউনিট সংখ্যা।

ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ইপিজেডের নিরাপত্তা বাহিনীসহ মোট ২৫টি ইউনিট প্রায় ১৭ ঘণ্টা অভিযান চালায়। আধুনিক রোবটিক ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। রাতের দিকে হালকা বৃষ্টি নামায় দমকলকর্মীদের কাজে সহায়তা মেলে। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিস আনুষ্ঠানিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ঘোষণা দেয়। তবে তখনও ১৭টি ইউনিট ধোঁয়া ও ছাইয়ের নিচে লুকানো আগুন সম্পূর্ণ নেভাতে কাজ করে যাচ্ছিল।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেউ হতাহত না হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। পুড়ে গেছে কোটি টাকার কাঁচামাল, প্রস্তুত পণ্য ও যন্ত্রপাতি। ভবনের এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের মতে, দ্রুত উদ্ধারকাজ ও সময়মতো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করায় আগুন পাশের ভবনে ছড়াতে পারেনি—এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “ইপিজেড কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগে শ্রমিকদের বের করে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তাই হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবনটি কোড মেনে তৈরি হয়নি। এতে ফায়ার ফাইটারদের ভবনের ভেতরে প্রবেশে চরম অসুবিধা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “চারটি ফ্লোর গুদাম ছিল, সেখানে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লেগেছে। ভবনের দুই পাশ খোলা ছিল, কিন্তু পাশের ভবনগুলো ছিল খুবই কাছাকাছি—ফলে আগুন ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়েছিল।”

ভবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন,“ভবনের কলাম ও কাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। আমরা ভবনটিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি। কেউ যেন ভবনের ভেতরে প্রবেশ না করে, এজন্য আমরা সতর্কতামূলক ব্যানার টানানোর নির্দেশ দিয়েছি।”

তাজুল ইসলাম আরও জানান, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদনে আগুনের উৎস, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি তুলে ধরা হবে। সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুস সোবহান বলেন,“আগুন লাগার পর আমরা এলাকা কর্ডন করি এবং শ্রমিকদের নিরাপদে সরিয়ে আনি। আল্লাহর রহমতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসতে পেরেছি।”

“সিইপিজেডের প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরুর আগে ফায়ার কমপ্লায়েন্স সনদ নিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট ভবনও কমপ্লায়েন্সের আওতায় ছিল। এমনকি কয়েকদিন আগেই শ্রমিকদের নিয়ে ফায়ার ড্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।”

তবু নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে তিনি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানান। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আগুন নেভানোর পুরো অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নৌবাহিনীর বিশেষ ইউনিট পানির সরবরাহ নিশ্চিত করে, বিমানবাহিনী আকাশপথে পর্যবেক্ষণ চালায় এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা এলাকা কর্ডন করে জনগণকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও ইপিজেডের নিরাপত্তা বাহিনীও ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে গুদামে দাহ্য কাপড়, রাসায়নিক দ্রব্য ও কার্টন থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম নগর ও পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকায় গত এক দশকে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বারবার ঘটছে। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন পর রিপোর্ট আসে—কিন্তু বাস্তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফায়ার সার্ভিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“প্রায় ৭০ শতাংশ শিল্প ভবনই এখনও ফায়ার কোড অনুযায়ী নির্মিত নয়। নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণও অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই।”ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম ইপিজেডের সব শিল্প কারখানাকে জরুরি ভিত্তিতে কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেশন পুনর্নবায়ন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ফায়ার সার্ভিস পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন,“এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড শুধু মালিক নয়, দেশের অর্থনীতিরও বড় ক্ষতি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে অগ্নি–নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তাঃ চট্টগ্রাম ইপিজেড দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প অঞ্চল, যেখানে লাখো শ্রমিক কর্মরত। এখানকার প্রতিটি কারখানায় রয়েছে রপ্তানিমুখী উৎপাদন। এমন অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, দেশের ভাবমূর্তিরও চরম ক্ষতি।

এই অগ্নিকাণ্ড আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রস্তুতির ঘাটতি, মানহীন নির্মাণ ও অগ্নি নিরাপত্তায় উদাসীনতা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। চট্টগ্রাম ইপিজেডের আগুন এখন নিভে গেছে, কিন্তু প্রশ্ন জাগছে—এই ধোঁয়ার ভেতর কতটা লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের আরও অগ্নিকাণ্ডের বার্তা? তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হয়তো দায় নির্ধারণ করবে, কিন্তু প্রয়োজন আরও বড় কিছু—প্রতিরোধ ও সচেতনতা, যাতে কোনো শ্রমিকের জীবন আর কখনো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আটকে না পড়ে।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর

© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫ দৈনিক বর্তমান সংবাদ