
মোঃ শহিদুল ইসলাম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ইসমাইল টাওয়ারে সংঘটিত এক মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আবিদা তাসমিন (৩২)। স্বামীর লোভ, নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর ২০২৫) সন্ধ্যায় ৯ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আবিদা তাসমিনের বিয়ে হয় সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফ (৩৮)-এর সঙ্গে। প্রথমে তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ইসমাইল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় যে ফ্ল্যাটে তারা বসবাস করতেন, সেটির মালিকানা ছিল তাসমিনের নামে। দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাটটি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য মারুফ স্ত্রীর ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
প্রতিবেশীরা জানান, গত দুই বছর ধরে দাম্পত্য কলহ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। স্বামীর লোভ, সন্দেহপ্রবণতা ও নির্যাতনের কারণে তাসমিন মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন এবং একাধিকবার আত্মহত্যার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাসমিন প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন। কিছু সময় পর ভবনের নিচে চিৎকার শুনে স্থানীয়রা দৌড়ে এসে দেখেন—রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন তাসমিন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ৯ তলা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন।
পরে স্বামী মারুফ ও স্থানীয়রা তাকে প্রথমে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে, পরে পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা অবস্থার অবনতি দেখে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
রাত ৯টার দিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে— “Brought in Dead / Fall from Height.”
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শুক্রবার সকালে চকবাজার থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে স্বামী সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফকে গ্রেফতার করে।চকবাজার থানার ওসি জানান, “ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। প্রাথমিক তদন্তে স্বামীর নির্যাতন ও মানসিক চাপই আত্মহত্যার পেছনে বড় কারণ বলে মনে হচ্ছে। তদন্ত চলছে।”
স্থানীয়রা বলেন, “একজন নারীকে বছরের পর বছর মানসিকভাবে নির্যাতন করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে।”
নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, “এ ধরনের ঘটনা সমাজে ক্রমেই বাড়ছে। কেবল গ্রেফতার নয়—এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচার ও ভুক্তভোগী পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।”
চকবাজার থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও পারিবারিক বিবৃতি যাচাই করে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র প্রস্তুত করছেন। এলাকাবাসী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা—আবিদা তাসমিনের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থাকে; তার জন্য বিচার যেন হয় দ্রুত, দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক।