
মোঃ শহিদুল ইসলাম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নতুন করে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এটি কি নিছক অবহেলা, নাকি পরিকল্পিত ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা? স্বাধীন বাংলাদেশের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঐতিহাসিক নামফলক দীর্ঘদিন ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকার পর উদ্ধার হয়েছে।প্রায় ৪৮ বছর আগের এই দুর্লভ নিদর্শন যেভাবে পরিত্যক্ত গোডাউনের কাদা, ময়লা ও পানির মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল, তা সচেতন মহলের কাছে স্পষ্টভাবে ইতিহাস বিকৃতির আলামত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ নামফলক তথ্য অনুযায়ী, নামফলকটি একসময় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ভবনের সামনের দেয়ালেই স্থাপিত ছিল। কিন্তু কবে, কখন, কার নির্দেশে এটি সরানো হলো—সে প্রশ্নের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা আজও নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেও নেই কোনো সিদ্ধান্তের রেকর্ড। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বেআইনিভাবে সরানো হয়েছিল?গোডাউনে মিলল ইতিহাসের লাশ
গত ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) বিকেলে প্রেসক্লাবের একটি পরিত্যক্ত গোডাউন পরিষ্কারকালে বেরিয়ে আসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম সংবলিত ঐতিহাসিক ফলকটি। গোডাউনটি ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত, চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, কাদা ও আবর্জনার ভাগাড়।
পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটির সময় ময়লার স্তূপের ভেতর কাদা-পানিতে একাকার হয়ে থাকা ফলকটি শনাক্ত করা হয়। উদ্ধারকারী প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এটি না পাওয়া গেলে হয়তো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল চিরতরে নষ্ট হয়ে যেত।১৯৭৮ সালের সাক্ষ্য বহনকারী ফলক
প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ১১ ফাল্গুন ১৩৮৪ (শুক্রবার) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নামফলকটি সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বহন করছিল।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে একটি
প্রভাবশালী গোষ্ঠী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর পরিকল্পিতভাবে শহীদ জিয়ার নাম সংবলিত ফলকটি সরিয়ে ফেলা হয়—যা অনেকের মতে রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত ইতিহাস বিকৃতির শামিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিত্তিপ্রস্তর বা ঐতিহাসিক স্থাপনার স্মারকফলক অপসারণ বা গোপন করা ফৌজদারি অপরাধ। দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি সম্পত্তি বিনষ্ট ও অনধিকার প্রবেশ (Criminal Mischief/Trespass) হিসেবে গণ্য হয়, যার শাস্তি কারাদণ্ড ও জরিমানা—উভয়ই হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত না করা হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষায় বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে। কারা দায়ী? তদন্তের দাবি জোরালো নামফলকটি কে সরিয়েছে, কেন সরিয়েছে, কার স্বার্থে সরিয়েছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার দাবি উঠেছে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক মহল থেকে। একই সঙ্গে ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
প্রেসক্লাব সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত ফলকটি আপাতত সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং যথাযথ মর্যাদায় পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু একটি নামফলক উদ্ধারের নয়—অনেকের মতে এটি সত্য ইতিহাস পুনরুদ্ধারের লড়াই, যেখানে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।