
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি-পশ্চিম) উন্মোচন করেছে চাঞ্চল্যকর “ক্লুলেস” হাসান তারেক হত্যা মামলার রহস্য। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি ঘাতক হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ওরফে আলো (৪১), যার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ও চুরি–সংক্রান্ত ১৮টি মামলা রয়েছে।
ডিবি (পশ্চিম)-এর অতিরিক্ত উপকমিশনারের নেতৃত্বে সোমবার (১০ নভেম্বর) রাতে চকবাজার থানার দামপাড়া এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে আলোকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি নোয়াখালীর সুধারাম থানার মাসিমপুর এলাকার হাজী তোফায়েল আহমেদের ছেলে।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, নিহত হাসান তারেক চলতি বছরের জানুয়ারিতে আলোসহ তার সহযোগীদের একটি বড় মাদকের চালান পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় আলো, শওকত আকবর ও মোর্শেদ আলম ওরফে সোহেল গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তারা প্রতিশোধ নিতে হত্যার পরিকল্পনা করে।
ঘটনার প্রায় ২০ দিন আগে জামালখান এলাকার একটি গলিতে বসে তিনজন মিলে হাসান তারেককে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ অক্টোবর রাতে কাজীর দেউড়ীতে অবস্থান নেয় আলো ও তার সহযোগীরা। শওকতের শ্যালক সাকিব ও সহযোগী ইকবাল হোসেন বাবু হাটহাজারী থেকে একটি গ্রামীণ সিএনজি নিয়ে আসে ঘটনাস্থলে।
শওকত হত্যার খরচ হিসেবে আলাউদ্দিনকে ২০ হাজার টাকা দেয়। এরপর তারা গরীবউল্লাহ শাহ (রঃ) মাজার সংলগ্ন সেজুতি ট্রাভেলস কাউন্টারের সামনে থেকে হাসান তারেককে কৌশলে সিএনজিতে তুলে নেয়।
সিএনজি বায়েজীদ লিংক রোডের নির্জন স্থানে পৌঁছালে ভিকটিমের হাত পিছমোড়া করে নাইলনের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে একই দড়ি গলায় পেঁচিয়ে দুই পাশ থেকে টান দিলে হাসান তারেক শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। প্রায় ২০ মিনিট পর নিশ্চিত হওয়ার পর ঘাতকরা লাশটি সিএনজিতে তুলে পাহাড়তলী থানাধীন খেজুরতলী রাসমনি ঘাটের পাশে রানীপুকুরপাড় এলাকায় ফেলে আসে।
হত্যার পর ঘাতকরা পাহাড়তলী থানার সামনে “কুটুম বাড়ি” রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে এবং ২০ হাজার টাকার মধ্যে আলো সহযোগীদের ভাগ বুঝিয়ে দেয় — মোর্শেদকে ৫ হাজার, সাকিব ও ইকবালকে ২ হাজার করে এবং সিএনজি চালককে ২ হাজার টাকা দেয়।
আলাউদ্দিনকে গ্রেফতারের সময় তার হেফাজত থেকে ১২ বোতল নিষিদ্ধ Codeine Phosphate & Tripolidine Hydrochloride Syrup (ESKuf) উদ্ধার করে ডিবি। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আলো একজন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী, যিনি মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হত্যা ও চাঁদাবাজিতেও জড়িত।
ডিবি-পশ্চিমের কর্মকর্তারা জানান, হাসান তারেক হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন “ক্লুলেস” হিসেবে চিহ্নিত ছিল। অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোয়েন্দা তৎপরতায় হত্যার পূর্ণ পরিকল্পনা ও অপরাধীদের পরিচয় উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। মামলার অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রামের অপরাধচিত্রে এটি এক ভয়াবহ প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড, যা আবারও প্রমাণ করে— মাদক ব্যবসার অন্ধকার জগতে
বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য দিতে হয় প্রাণ দিয়ে।