
সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বাঁশমালী নৃগোষ্ঠী আমাদের সমাজের এক বিশেষ অংশ। মূলধারার সমাজ থেকে কিছুটা আলাদা হলেও তারা নিজেদের ঐতিহ্য, পেশা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাদের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সংগ্রাম এক অনন্য অধ্যায়, যা সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ক্ষেত্র হতে পারে।
এই সম্প্রদায়ের প্রধান জীবিকা হলো পশুপালন, বিশেষ করে শূকর পালন। বাঁশমালীরা বিশ্বাস করে, শূকর পালন শুধু তাদের অর্থনৈতিক সমর্থন নয়, বরং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া একটি উত্তরাধিকার। পালিগাঁও গ্রামের সুধীর চন্দ্র, দানিয়াল ও মাটিয়াসদের মতো পরিবারগুলো প্রায় চল্লিশটিরও বেশি শূকর পালন করে, যা সংখ্যা হিসেবে একশোরও অধিক। এই পশুগুলো তাদের জীবনের মূল পুঁজি। শূকরের জন্ম থেকে শুরু করে অন্তত পাঁচ মাস পর্যন্ত তারা সর্বোচ্চ যত্ন নেয়—খাদ্য যোগান দেয়, অসুখ-বিসুখ সামলায় এবং নিরাপদে রাখে।
তবে এই জীবন সহজ নয়। বছরে অন্তত ছয় মাস তাদের বাইরে বের হতে হয়। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র গিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে, শূকর বিক্রি বা বাজারজাত করার জন্য। অনেক সময় গ্রামীণ হাটে কিংবা শহরের পশুর বাজারে শূকর নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। এই ভ্রাম্যমাণ বা যাযাবর জীবনযাপন তাদের সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক হিসাব করলে দেখা যায়, শূকর পালনের মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। কিন্তু এই আয় পুরোপুরি তাদের হাতে আসে না। একজন মাহাজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে কিংবা অগ্রিম টাকা নিয়ে তারা শূকর পালন শুরু করে। ফলে আয় থেকে প্রথমেই ধার শোধ করতে হয়। অন্যদিকে, পরিবারের প্রতিজনের মাসিক খাবারের খরচ প্রায় তিন হাজার টাকা। সংসারে যদি পাঁচ-ছয়জন সদস্য থাকে, তাহলে শুধু খাবারেই বড় অঙ্কের টাকা চলে যায়। সেই সঙ্গে পশুর খাবার, ওষুধপত্র, অস্থায়ী বসবাসের খরচ ইত্যাদি মিলে হাতে সঞ্চয় থাকে অতি সামান্য। অর্থাৎ তাদের আয়-ব্যয় সমীকরণ সবসময়ই টানাপোড়েনে ভরা।
তবুও, বাঁশমালী সম্প্রদায় হাল ছাড়ে না। পরিশ্রম, ধৈর্য এবং জীবিকা রক্ষার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা এগিয়ে চলে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে কাজ করে। পুরুষরা শূকর চরানো, বাজারজাতকরণ ও বিক্রির দায়িত্ব নেয়, আর নারীরা ঘরে শূকর পরিচর্যা, রান্না এবং গৃহস্থালির কাজ সামলায়। শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে এই কাজে অভ্যস্ত করা হয়, যেন তারা ভবিষ্যতে এই পেশাকে চালিয়ে নিতে পারে।
বাঁশমালী নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা সমাজের মূলধারা থেকে আলাদা হলেও তাদের অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের শ্রম, ঐতিহ্য এবং সংগ্রাম স্থানীয় অর্থনীতির এক ক্ষুদ্র হলেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে তাদের জীবনধারা আমাদের সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। তারা দেখিয়ে দেয় কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা সম্ভব।
বেলাশেষে আমরা এই উপসংহার টানতে পারি যে বাঁশমালী সম্প্রদায়ের জীবনাচরণ আমাদের কাছে শুধু একটি নৃগোষ্ঠীর কাহিনি নয়, বরং সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও আত্মনির্ভরশীলতার এক জীবন্ত দলিল।