
বিনিয়োগের ধস ঠেকাতে হবেঃ
দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এর মূল কারণ বিনিয়োগে স্থবিরতা। দেশি বা বিদেশি কোনো উদ্যোগেই ভালো সাড়া নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চিত ব্যাবসায়িক পরিবেশ, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা—বলতে গেলে প্রায় কোনো কিছুই বিনিয়োগের অনুকূলে নয়।
আর তার ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গেল মার্চ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে মাত্র এক লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৩.৪৬ শতাংশ কম। বিনিয়োগ কমার পাশাপাশি বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। থমকে গেছেন দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও।
অনেক কলকারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থাহীনতা আর অনিশ্চয়তার এই দীর্ঘ ছায়া দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিনিয়োগ একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, বিশেষ করে শিল্প-কারখানা ও সেবা খাতে। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থাকলে কেউ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবেন না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগকারীরা চান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিক নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা। কেবল নির্বাচিত সরকারই এ ধরনের ধারাবাহিকতা দিতে পারে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) চিত্রও হতাশাজনক। গেল মার্চ প্রান্তিকে ইপিজেডে বিনিয়োগ কমেছে ১৯.৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রসেসিং জোন কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ইপিজেডগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২.৩৩ শতাংশ।
নতুন বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বাড়বে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিনিয়োগ নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিনিয়োগবান্ধব নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হওয়ার কথা নয় এবং হচ্ছেনও না।’ তিনি আরো যোগ করেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যার নেতিবাচক চিত্র ইপিজেডসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও স্পষ্ট। ড. মুজেরির বিশ্বাস, যত দিন একটি রাজনৈতিক তথা নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব না নেবে, তত দিন বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবিরও মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সরকার না আসায় বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদরা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, করহার ও সুদহার যৌক্তিক মাত্রায় আনা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্পোৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অবকাঠামো ও নীতি সহায়ক ব্যবস্থার সংস্কার করা। তাঁদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। তাঁরা দেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের কোনো চাহিদাই নেই, এমন স্থবিরতা গত ২০-২২ বছরেও দেখা যায়নি।
আমরা মনে করি, বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। আর এ জন্য দ্রুত নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করুনঃ-
বাংলাদেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে এই চিত্রই স্পষ্ট হয়। রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বিরোধ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা কারণে খুনখারাবি বাড়ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
এসব কারণে সমাজে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি বড় আশঙ্কার কারণ হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৫) রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫১ জন নিহত এবং সাত হাজার ৬২৬ জন আহত হয়েছেন।
এসব সহিংসতা মূলত রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, প্রতিশোধপরায়ণতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা বা পক্ষপাতমূলক আচরণ এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার বাইরেও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রামে সাড়ে ৯ মাসে ১৪৪টি হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজে সহিংসতার ভয়াবহ বিস্তারকেই প্রমাণ করছে।
জায়গাজমির বিরোধ, মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেখানে রক্তপাতের বড় কারণ। রাজধানীতেও চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে। চাঁদা না পেয়ে নারীকে ছুরিকাঘাত ও তাঁর ভাইকে গুলি করার ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা আইনের তোয়াক্কা করছে না। কক্সবাজার, গোপালগঞ্জসহ সারা দেশেই হত্যাকাণ্ডসহ নৃশংস অপরাধের চিত্র কমবেশি প্রায় একই রকম। বাড়ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার।
কিশোর গ্যাং নামের উঠতি বয়সী অপরাধীদের কারণে মানুষের মান-সম্মান নিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। পরিস্থিতি উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্রুত বিচারের পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীরা যেন মনে না করতে না পারে যে খুন বা সহিংসতা করেও পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) এ বছরের গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ একলাফে আগেরবারের চেয়ে ৩৩ ধাপ পিছিয়েছে। এক বেলা না খেয়ে হলেও মানুষ নিরাপদে ও মান-সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে চায়। আর সেই নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।